অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক আজকের কণ্ঠ ‘বিএনপির সমঝোতা প্রস্তাব নাকচ করলো আওয়ামী লীগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে কোনো সমস্যা নেই, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদুর রহমানের এমন মন্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগ সমঝোতার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেছে।
দাবিটির সূত্র হিসেবে প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের একটি লেখা উল্লেখ করা হয়েছে। লেখাটির শিরোনাম ‘সমঝোতা প্রসঙ্গে’। অনুসন্ধানে দেখা যায়, লেখাটি প্রথমে মোহাম্মদ আলী আরাফাত তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন। পরে সেটিই আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে শেয়ার করা হয়।
অর্থাৎ, দৈনিক আজকের কণ্ঠের প্রতিবেদনে একদিকে ডা. জাহেদুর রহমানের বক্তব্যকে ‘বিএনপির সমঝোতা প্রস্তাব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, অন্যদিকে সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আলী আরাফাতের ‘সমঝোতা প্রসঙ্গে’ লেখাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ওই প্রস্তাবের জবাব হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ডা. জাহেদের বক্তব্য যাচাই করে এমন কোনো সমঝোতা প্রস্তাবের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
ডা. জাহেদুর রহমান কী বলেছিলেন?
গতকাল ৬ অক্টোবর সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সচিবালয়ে ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদুর রহমান। সেখানে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে রিকনসিলিয়েশন (reconciliation) প্রসঙ্গে সরকারের ভাবনা তুলে ধরেন তিনি। ডা. জাহেদের বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন,
“আমরা দ্বিমত করি না একটা রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। এই আলাপগুলো পাঁচ আগস্টের পর থেকে আমরা প্রচুর করেছি।”
এরপর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“দুর্ভাগ্যজনকভাবে এদেশের একটা সংখ্যার মানুষ (আমি আওয়ামী লীগের পালিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের কথা বলছি না) এই ঘটনার পরও এখনো আওয়ামী লীগ সমর্থন করে। এই দেশের নাগরিক তারা। তাদের সঙ্গে একটি রিকনসিলিয়েশন খারাপ আইডিয়া না। এটা হলে ভালো হতো।”
তবে একই বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন, রিকনসিলিয়েশন নিয়ে আলোচনা করার আগে এর মৌলিক ভিত্তি কী হবে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“কিন্তু রিকনসিলিয়েশনের আদি শর্তটা কী? কোন ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রিকনসিলিয়েশন হয়! রিকনসিলিয়েশনের বেসিক হচ্ছে যেই গ্রুপ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল সে যে অপরাধটা করেছে তার স্বীকৃতি থাকা। সেটা নিয়ে তাদের রিপেন্টেন্স থাকা।”
এরপর তিনি বলেন, “অপরাধের স্বীকৃতি এবং রিপেন্টেন্সের পরেও রিকনসিলিয়েশনের প্রশ্ন আছে। কারণ অপরাধের স্বীকৃতি দিলেই আসলে ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হয় না। এটার বিরুদ্ধে লিগাল একশন হতে হয়।”
ডা. জাহেদুর রহমান আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে আলোচনা হতে পারত। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও দলটির প্রধান নেত্রীর সাম্প্রতিক অবস্থানের কারণে সরকারের পক্ষ থেকে সেই আলোচনা গ্রহণ করা কঠিন। তার বক্তব্য,
“কিন্তু আমরা খুব অবাক হয়ে ৫ তারিখের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেখছি সেই দলটা সেই দলের প্রধান নেত্রী এখনো ব্লেইম করছেন আমাদের, আমাদেরকে হুমকি দিচ্ছেন। যদি তাই হয়ে থাকে আসলে এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রিকনসিলিয়েশনের আলাপটা আমাদের দিক থেকে অন্তত এন্টারটেইন করা কঠিন।”
সবশেষে তিনি বলেন,
“তারা চাইছেন না, রিকনসিলিয়েশন তো তাদের চাইতে হবে। কেউ যদি মাঝখান থেকে রিকনসিলিয়েশন চেয়ে থাকেন, যদি তারা মনে করেন এটা ভালো (আমিও মনে করি ভালো) তাদের উচিত হবে আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ করা। রিকনসিলিয়েশন শুরু হওয়ার মত একদম ফান্ডামেন্টাল যে জায়গাটা সেটা যেন তারা নিশ্চিত করেন। সেটুকু হলে সে আলাপ তো হতেই পারে।”
অর্থাৎ, ডা. জাহেদের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে একটি শর্তসাপেক্ষ রাজনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা এবং সেই আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক শর্তের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে কোনো ‘সমঝোতা প্রস্তাব’ দেওয়ার কথা বলা হয়নি।
ডা. জাহেদের বক্তব্য যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে
ডা. জাহেদের বক্তব্যের পর গতকাল দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলন অসম্ভব নয়’ শিরোনামে সংবাদ ও ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়। মাছরাঙা টেলিভিশন, কালের কণ্ঠ, বাংলাভিশন ও বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম একই ধরনের শিরোনামে সংবাদটি প্রচার করে।
কিন্তু তার পূর্ণ বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি একইসঙ্গে রিকনসিলিয়েশনের মৌলিক শর্ত হিসেবে আওয়ামী লীগের অপরাধের স্বীকৃতি ও রিপেন্টেন্সের কথা বলেছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আলোচনা করা কঠিন বলেও জানিয়েছেন।
ফলে শুধু ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলন অসম্ভব নয়’ এভাবে বক্তব্যটি উপস্থাপন করলে ডা. জাহেদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও পরবর্তী অংশ বাদ পড়ে যায় এবং তার বক্তব্যের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তাহলে ‘বিএনপির সমঝোতা প্রস্তাব’ এলো কোথা থেকে?
ডা. জাহেদের বক্তব্যে বিএনপির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে কোনো সমঝোতা প্রস্তাব দেওয়ার কথা নেই। তিনি নিজেও বিএনপির কোনো প্রস্তাবের কথা বলেননি। বরং তিনি বলেন, কেউ যদি রিকনসিলিয়েশন ভালো মনে করেন, তাহলে “তাদের উচিত হবে আওয়ামী লীগের সাথে যোগাযোগ করা” এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক শর্ত নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ আলী আরাফাতের ‘সমঝোতা প্রসঙ্গে’ লেখার বিষয়বস্তু থেকে প্রতীয়মান হয়, তিনিও ডা. জাহেদের বক্তব্যকে সমঝোতার প্রসঙ্গ হিসেবে নিয়েই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে লেখাটি শেয়ার করা হয়।
ফলে ডা. জাহেদের বক্তব্যের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা শুধু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নয়, পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াতেও ‘সমঝোতা প্রস্তাব’ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে ডা. জাহেদের বক্তব্যের মূল বক্তব্যের সঙ্গে এই ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে। তিনি কোথাও বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে আনুষ্ঠানিক বা নির্দিষ্ট কোনো ‘সমঝোতা প্রস্তাব’ দেওয়ার কথা বলেননি। বরং তিনি রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি এর জন্য আওয়ামী লীগের অপরাধের স্বীকৃতি, রিপেন্টেন্স এবং অন্যান্য মৌলিক শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন।
তাই, ডা. জাহেদের বক্তব্যকে ‘বিএনপির সমঝোতা প্রস্তাব’ হিসেবে ধরে নিয়ে আলী আরাফাতের ‘সমঝোতা প্রসঙ্গে’ লেখাকে সেই প্রস্তাবের জবাব হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, ডা. জাহেদের বক্তব্যে এমন কোনো প্রস্তাবের উল্লেখ নেই।
অতএব, ডা. জাহেদুর রহমান আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন প্রসঙ্গে শর্তসাপেক্ষে সম্ভাব্য আলোচনার কথা বলেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন খারাপ ধারণা নয় বলে মন্তব্য করলেও একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের অপরাধের স্বীকৃতি, রিপেন্টেন্স এবং আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে এমন আলোচনা গ্রহণ করাও কঠিন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু তার বক্তব্যে বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে কোনো ‘সমঝোতা প্রস্তাব’ দেওয়ার তথ্য নেই।
সুতরাং, ডা. জাহেদের বক্তব্যকে বিএনপির ‘সমঝোতা প্রস্তাব’ হিসেবে উপস্থাপন করাই বিভ্রান্তিকর। একইভাবে, সেই কথিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে মোহাম্মদ আলী আরাফাতের দেওয়া প্রতিক্রিয়াটিও ভিত্তিহীন একটি দাবির ওপর প্রতিষ্ঠিত।